হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাত এবং ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) ও ইমাম রেজা (আ.)-এর শাহাদাত উপলক্ষে কাজাখস্তানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কার্যালয়ে একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে কাজাখস্তানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাজধানী আস্তানায় বসবাসরত ইরানিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কাজাখস্তানে ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ইসমাইলজাদেহ ইসলামের ধর্মীয় বিধান বা শরিয়ত থেকে ইসলামী সভ্যতায় রূপান্তর এবং বিশ্বের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে এর বিস্তার নিয়ে বক্তব্য দেন।
তিনি নবীজির একটি হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, কোনো পরিকল্পনা ও চিন্তার পূর্ণতা লাভের গুরুত্বের আলোকে নবুওয়তের মিশন ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা গঠনে একটি পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি ‘কুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তুফলিহু’-‘তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা সফল হবে’-এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ইসলাম এই ঘোষণা ও বাণীর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল এবং ইমাম রেজা (আ.)-এর বক্তব্য ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে একই মূল বাণী সংস্কৃতি ও সভ্যতার রূপ লাভ করে।
কাজাখস্তানে ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বলেন, ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্তৃত সভ্যতাগত অভিজ্ঞতা। চৌদ্দ শতাব্দী ধরে ইসলামের ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক উপাদানের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, এই সভ্যতা কোনো একক জাতি বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সৃষ্টি নয়; বরং ইসলামী ওহি, মুসলমানদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং হিজাজ থেকে খোরাসান, মাওরাউননহর, মধ্য এশিয়া, ভারত, ককেশাস, আনাতোলিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক সক্ষমতার সমন্বিত ফল।
ইসমাইলজাদেহ আরও বলেন, এই সভ্যতার বিকাশকে কয়েকটি পর্যায়ে দেখা যায়-মক্কায় ইসলামের আবির্ভাব, মদিনায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, কুফায় চিন্তাগত ও সামাজিক কাঠামোর ব্যাখ্যা এবং এরপর ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্র বৃহত্তর খোরাসানে স্থানান্তর।
এই ধারাবাহিকতায় ২০১ হিজরি সনে ইমাম রেজা (আ.)-এর মদিনা থেকে মাওয়ায় ঐতিহাসিক সফর ইসলামী বিশ্বের পূর্বাঞ্চলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান, সভ্যতাগত সংলাপ এবং ইসলামী চিন্তার বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি বলেন: ইমাম রেজা (আ.)-এর উপস্থিতির পর বৃহত্তর খোরাসান ও মাওরাউননহর ইসলামী জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
খাজা ইউসুফ হামাদানি, আবু সাঈদ আবুল খায়ের, আবুল ফজল খেরকানি, খাজা আহমদ ইয়াসাভি, নাজমুদ্দিন কুবরা, বাহাউদ্দিন নকশবন্দসহ বহু মহান সুফি ও চিন্তাবিদের আবির্ভাব এই অঞ্চলের ইসলামী সভ্যতা গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকার প্রমাণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক তরীকাগুলো শরিয়ত, নৈতিকতা ও জ্ঞানকে আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষার সঙ্গে যুক্ত করে বিভিন্ন সমাজে ইসলাম প্রচার ও বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
খাজা আহমদ ইয়াসাভি এবং তাঁর নামে সম্বন্ধিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দিওয়ানে হিকমত’ এই ধারার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাঁর মতে, এই ঐতিহ্য ইসলাম, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং খোরাসানের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
সমসাময়িক বিশ্বে চিন্তাগত ও আদর্শিক শূন্যতা এবং একটি সুসংহত চিন্তাধারার অভাবের ওপর জোর দিয়ে ইসমাইলজাদেহ বলেন, বর্তমান সময়ে ইসলামী জ্ঞান ও শিক্ষার ব্যাখ্যা এবং প্রচারের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
তিনি বলেন: আজ মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্রের আর কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রচারকরাও তাদের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আর ট্রাম্প মিনাবের শিশুদের ওপর হামলার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতার ফাঁপা কাঠামোর দিকে তার শেষ তীরটি নিক্ষেপ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এই শূন্যতার মধ্যে ইসলামী জ্ঞানই এমন একটি মানবকেন্দ্রিক সভ্যতার রূপ ধারণ করতে পারে, যা চরমপন্থা ও শৈথিল্য-উভয় ধরনের অতিরঞ্জন থেকে বিরত থাকে।
আপনার কমেন্ট